যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, এই অভিযান লাতিন আমেরিকায় মাদক সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগরে ভেনেজুয়েলার নৌযানে অন্তত ৩০ বার হামলা চালানো হয়েছে। যদিও মাদক বহনের অভিযোগের পক্ষে কোনও প্রমাণ দেয়নি মার্কিন বাহিনী।
গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো তুলে নিয়ে যায়। ট্রাম্প প্রশাসন তাকে ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। নিউইয়র্কে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক পাচারের অভিযোগের বিচার চলছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড যদি ঘণ্টায় গড়ে ২০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলে তাহলে ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগরে যেতে প্রায় ১০ দিন লাগতে পারে।
সিএসআইএস বলছে, সেখান থেকে পারস্য উপসাগর ও ইরানের উপকূলে পৌঁছাতে আরও এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। আল-জাজিরার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটোপোলাস বলেছেন, সুয়েজ খাল পেরোতে হলে সময় আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, আমি মনে করি না তারা এটিকে ইরানের এত কাছে নিয়ে যাবে। কারণ এতে ইরানের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালে চলে আসবে এই রণতরী। জেরাল্ড ফোর্ড ছাড়াও ভূমধ্যসাগর থেকে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্ট্রাইক গ্রুপের জাহাজগুলোও ক্যারিবীয় সাগরে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঘাত হানার সক্ষমতা গত জুনের তুলনায় বর্তমানে অনেক কম।
গত বছরের মার্চে ইরান ও হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে উত্তেজনার মাঝে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোরদার করে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট সেন্টকম এলাকায় পাঠানো হয়। তবে গত ৩০ অক্টোবর ওই ইউনিটটির সামরিক রসদ বৃদ্ধির জন্য আবারও দক্ষিণ কোরিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
• মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কী সামরিক উপস্থিতি আছে?
যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেওয়া হলেও মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী ও অস্থায়ী অন্তত ১৯টি স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এখনও রয়েছে। গত জুন থেকে এখন পর্যন্ত এ অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
এর মধ্যে বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, বুধবারের মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন সেনাকে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তবে এর কারণ স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এই মার্কিন ঘাঁটিতে ১০ হাজার সৈন্য রয়েছে। গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল।
মার্কিন এক কূটনীতিক বলেছেন, এটি একটি অবস্থানগত পরিবর্তন; আনুষ্ঠানিক সরিয়ে নেওয়া নয়। এর আগে, মার্কিন বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে অন্তত দুটি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনায় ১৪টি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের এখনও এই ধরনের হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।
• ইরানের নেতৃত্বকে কি লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে?
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য-এশিয়াবিষয়ক রাজনীতির অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহ আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প স্বল্পমেয়াদি, দ্রুত এবং মার্কিন সৈন্যদের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পছন্দ করেন।
ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে অপহরণ এবং ২০২০ সালে বাগদাদে ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্স প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার উদাহরণ দেন এই অধ্যাপক। গত জুনে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, আমরা জানি তথাকথিত ‘সর্বোচ্চ নেতা’ কোথায় লুকিয়ে আছেন। পোস্টে তিনি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কথা বলেন।
তিনি লেখেন, খামেনি সহজ লক্ষ্য, কিন্তু আপাতত নিরাপদ। আমরা এখনই তাকে হত্যা করব না। তবে আমরা চাই না বেসামরিক মানুষ বা মার্কিন সেনাদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হোক। আমাদের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে।
আকবরজাদেহ বলেন, সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনা থাকলে ট্রাম্পকে অনিবার্য প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তার মতে, সর্বোচ্চ নেতাকে অপসারণ করা হলে ক্ষমতার শূন্যতায় আইআরজিসিই সবচেয়ে সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে; যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ইরান হয়তো প্রকাশ্য সামরিক শাসনে চলে যাবে, যা বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের চেয়েও ওয়াশিংটনের প্রতি বেশি বৈরী হবে।
• স্থল হামলা কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানে সেনা পাঠানো একেবারে অসম্ভব। আকবরজাদেহ বলেন, ট্রাম্প রাষ্ট্র গঠনকারী নন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অঙ্গীকারে বিশ্বাস করেন না। আফগানিস্তান থেকে তিনি সরে এসেছেন। তাই ইরানে স্থল সেনা পাঠানো তার জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে।
ট্রাম্পের শাসনামলে আফগানিস্তানে ২০০১ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ।
২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান কাতারের দোহায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ২০২১ সালে জো বাইডেনের শাসনামলে সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়।
সূত্র: আল-জাজিরা।
Comments
Post a Comment