একাত্তরে রাজনীতিতে ইসলামী: রাজনৈতিক, রাজাকার গণনাট্য ও নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস।
জামায়াতে ইসলামী—পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত ভূমিকা পালন করেছে।
গোলাম আযম ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান :
একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি ছিলেন গোলাম আযম। মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস তিনি প্রকাশ্যভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘ভারতীয় দালাল’ আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে তাদের দমনে উৎসাহ দেন। ৪ এপ্রিল, অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে ঢাকা ও সারাদেশে গণহত্যা শুরুর পর গোলাম আযম টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই বৈঠকে তিনি ও অন্যান্য পাকিস্তানপন্থী নেতারা সামরিক আইন প্রশাসনকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং তথাকথিত ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ ফিরিয়ে আনার নামে ঢাকায় নাগরিক শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনীতে গোলাম আযম গণহত্যায় সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও সেই সময়ের কোনো পত্রিকা—এমনকি জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামেও—তার এই দাবির পক্ষে কোনো প্রতিবাদ বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বরং বৈঠকের পর তাকে পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় আরও সক্রিয় দেখা যায়। পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাও ফরমান আলী তার বই How Pakistan Got Divided-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে গোলাম আযমসহ জামায়াত নেতারা টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শান্তি কমিটি গঠনে সম্মত হন এবং তারা ছিলেন ‘truly loyal Pakistanis’।
শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী :
১০ এপ্রিল গঠিত হয় ‘নাগরিক শান্তি কমিটি’, যার ওয়ার্কিং কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন গোলাম আযম। ২০ এপ্রিল সারাদেশে শান্তি কমিটি বিস্তারের দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত করা হয়। ২৩ এপ্রিল কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক প্রেস রিলিজে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূলে জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। ২১ মে জামায়াতে ইসলামী বিবৃতি দিয়ে অপারেশন সার্চলাইট ও লক্ষাধিক মানুষের হত্যাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘সময়োচিত পদক্ষেপ’ বলে সমর্থন করে। এই সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় খুলনায় জামায়াত নেতা একেএম ইউসুফের নেতৃত্বে গঠিত হয় রাজাকার বাহিনী। ১ জুন টিক্কা খানের সরকার এই বাহিনীকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। পাকিস্তান সরকারের গোপন নথিতে উল্লেখ রয়েছে—রাজাকার বাহিনীর সদস্য সংগ্রহ হতো মূলত শান্তি কমিটি ও পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে, এবং সেই রাজাকারদের কর্মকাণ্ডের দায়ও সংশ্লিষ্ট শান্তি কমিটির সদস্যদের ওপর বর্তাত।
অর্থাৎ, রাজাকার বাহিনীর অপরাধের দায় থেকে গোলাম আযম ও জামায়াত নেতারা কোনোভাবেই মুক্ত নন।
জামায়াতের বক্তব্য ও স্বীকারোক্তি :
১৯৭১ সালের ৮ জুলাই জামায়াতের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক এক বিবৃতিতে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দুষ্কৃতিকারী’ ও ‘ভারতীয় এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে রাজাকার প্রশিক্ষণকে সমর্থন জানান। ২১ জুন গোলাম আযম লাহোরে গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের জন্য ‘গভীর শ্রদ্ধা’ জানান। ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তিনি প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘দেশের শত্রু’ ঘোষণা করেন এবং শান্তি কমিটি ও সেনাবাহিনীর যৌথ তৎপরতার ওপর জোর দেন। সেপ্টেম্বরে জামায়াত নেতাদের সরকারে অন্তর্ভুক্তির সংবর্ধনায় গোলাম আযম নিজেই স্বীকার করেন যে, যে উদ্দেশ্যে জামায়াত রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটিতে লোক পাঠিয়েছে, সেই একই উদ্দেশ্যে তারা মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছে। তিনি আরও বলেন—মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হাজারো জামায়াত কর্মী মূলত রাজাকার বাহিনীর অংশ ছিল।
আল-বদর ও আল-শামস: বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা :
রাজাকার বাহিনীর পাশাপাশি জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘের কর্মীদের নিয়ে গঠিত হয় আল-বদর ও আল-শামস। পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা এএকে নিয়াজি ও সিদ্দিক সালিকের বইয়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—এই বাহিনীগুলো ছিল জামায়াত-নিয়ন্ত্রিত এবং সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আল-বদরের সদস্যরাই মূলত ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়, যার আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়েছিল: “125 Slain in Dacca Area Believed Elite of Bengal”।
পরিণতি ও পালিয়ে যাওয়া :
নভেম্বরে গোলাম আযম রাজাকারদের জন্য আরও উন্নত অস্ত্র দাবি করেন। কিন্তু যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে না ফিরে পাকিস্তান হয়ে সৌদি আরব ও পরে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান। একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—এটি নথিভুক্ত ইতিহাস। শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস গঠনের মাধ্যমে তারা সরাসরি গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল।
ইতিহাস ভুলে গেলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি হয়। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় এই সত্যগুলো জানা, বলা ও মনে রাখা জরুরি।
Comments
Post a Comment