বিশ্ব শাসনের নতুন লড়াই
বিশ্বশাসনের এক দুর্বার লড়াই শুরু হয়েছে, যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি না থাকলেও রয়েছে সম্পর্কের গতিপথ আগলে রাখার এক নিরন্তর কৌশল। এখন পশ্চিমা কৌশল বা আধিপত্যবাদের কাছে চীন তার বলয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে তা দেখার বিষয়। তবে তিন নেতার বৈঠকের মধ্যদিয়ে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বিশ্বের ভারসাম্য রক্ষায় সুদৃঢ়প্রসারী ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ব এখন রূপান্তরের মধ্যদিয়ে নয়া মেরুকরণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভবিষ্যতের নতুন লড়াই বিশ্ব মোড়লদের কপালের ভাঁজ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েক দশক ধরেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। এরই মধ্যে চীনের তিয়ানজিন শহরে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন।
তিন দেশের সরকারপ্রধানের ঐক্যের মধ্যদিয়ে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার এক নতুন পথনকশা তৈরি করবে। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোদি, পুতিন এবং শি জিনপিং একান্তে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সবাইকে খোশগল্পে মেতে থাকতে দেখা গেছে। তিন নেতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিও পোস্ট করেছেন মোদি। ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়নের মধ্যে তিন নেতার বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতা সামনে এল। এ ঘটনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি স্পষ্টবার্তা বহন করছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে মোদি ও পুতিনের এ ঘনিষ্ঠতা ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। এসসিও সম্মেলনে পুতিনের সঙ্গে মোদির ঘনিষ্ঠতায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে রাশিয়ার তেল কেনার মাধ্যমে দেশটিকে রসদ জোগাচ্ছে ভারত। ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বেসেন্টের মতো ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমালোচনা করেছেন। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নাভারো বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতন্ত্রের নেতা হিসেবে মোদিকে বিশ্বে দুই প্রধান স্বৈরতান্ত্রিক নেতা পুতিন ও শি জিনপিং-এর সঙ্গে মেলামেশা করতে দেখা লজ্জার বিষয়। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
চীন ও ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা। এর জেরে ট্রাম্প ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। চীনের প্রেসিডেন্টও এ সম্মেলনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের ওপর গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি এক নয়া বিশ্বব্যবস্থার ভিত গাড়লেন এ সম্মেলনের মাধ্যমে। সম্মেলনে পুতিনও ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে দায়ী করেন। চীনা ড্রাগনের স্পষ্ট ইঙ্গিত পুরোনো আধিপত্য আর ক্ষমতার লড়াই করে বেশি দিন টিকে থাকা যায় না। বিশ্বকে সামনের কাতারে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন বহুমুখী ও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক টেকসই নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করবেন তারা। এটি এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। চীন ও ভারতের সম্পর্ক যদি ঘনিষ্ঠ হয় তাহলে এর প্রভাব ইতিবাচক হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভূরাজনৈতিক অবস্থা। চীন ও ভারত যদি সুবিধাজনক অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের প্রকৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এটিই হয়ে উঠবে একুশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন।
এসসিও সম্মেলনকে ভারত-চীন সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ হিসেবেও দেখছেন অনেকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিকল্প বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার মডেল দেখাতেই এ সম্মেলনকে কাজে লাগিয়েছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র যখন বিভিন্ন বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে সরে আসছে এবং একের পর এক অস্থির শুল্কনীতি গ্রহণ করছে, ঠিক সে সময়ে এ সম্মেলন চীনের নিজস্ব নেতৃত্বের কৌশল প্রমাণ করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। এ সম্মেলন চীন ও রাশিয়ার জন্য কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থার সামনে বিকল্প বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার কৌশল। এখানে চীন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যকেই ইঙ্গিত করেছেন। অতীতে এসসিও-কে এত গুরুত্ব দেয়নি ভারত। এবার যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নিয়ে চাপের মুখে এসসিও সম্মেলনে যোগ দেন মোদি। এসসিও মূলত আঞ্চলিক একটি জোট। এর লক্ষ্য হলো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প এক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। এরই মধ্যে ৮০ বছরের বিজয় উৎসব পালন করছে চীন।
এটি চীনের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সামরিক কুচকাওয়াজ। এ কুচকাওয়াজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল নতুন প্রজন্মের মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান বা চার পেয়ে যুদ্ধযান ‘নেকড়ে রোবট’। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মোকাবিলায় এগুলো সক্ষম বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এ আয়োজন শুধু সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে নতুন এক শক্তি জাগিয়ে তোলার কৌশলও। যা একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার জন্য চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধকে তুলে ধরে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোকে নিয়ে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত করার প্রয়াসে চীন অনেকটাই কৌশলী ভূমিকায় রয়েছে। চীন ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও ভালো পর্যায়ে রয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মন্তব্য করেছেন, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্কের কৌশলগত প্রকৃতি প্রতিফলিত করে, যা বর্তমানে অনন্য মাত্রায় পৌঁছেছে। এ সম্পর্কের নতুন গতিপথ এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তির নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। বিশ্বশাসনের এক দুর্বার লড়াই শুরু হয়েছে, যেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি না থাকলেও রয়েছে সম্পর্কের গতিপথ আগলে রাখার এক নিরন্তর কৌশল। এখন পশ্চিমা কৌশল বা আধিপত্যবাদের কাছে চীন তার বলয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে তা দেখার বিষয়। তবে তিন নেতার বৈঠকের মধ্যদিয়ে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বিশ্বের ভারসাম্য রক্ষায় সুদৃঢ়প্রসারী ভূমিকা রাখবে।
Comments
Post a Comment