ডাকসু নির্বাচন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হতে চান তারা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা দেওয়া শেষ হয়েছে। ডাকসু ও হল সংসদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ১ হাজার ৬১৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মোট ২৬২ পদের বিপরীতে এই দেড় হাজারের বেশি প্রার্থী শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। আগামী ২৬ আগস্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। প্রাথমিক মনোয়নপত্র জমার মাধ্যমে নির্বাচনে নয়টি পূর্ণাঙ্গ প্যানেলে ভোটে লড়বে। এ ছাড়া আংশিক একটি প্যানেলও রয়েছে। সব প্যানেলেই বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা দেখা গেছে। অভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থীদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ছয়টি ছাত্র সংগঠন একটি পদে প্রার্থী দেয়নি। অন্যরা ইনক্লুসিভ প্যানেল তৈরির চেষ্টা করেছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে জমা দেননি ৪৬৭ জন। আজ বৃহস্পতিবার প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হবে।

নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা জানান, ডাকসুতে ২৮টি পদের বিপরীতে ৬৫৮ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। জমা দেননি ১৪৯ জন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন ব্রিফিংকালে জানান, ডাকসুতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫০৯ জন।

হল সংসদ নির্বাচনে ১৮টি হলের ২৩৪ পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র নেন ১ হাজার ৪২৭ জন। ৩১৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর জানায়, ১৮টি হলে মোট ১ হাজার ১০৯টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। 

হলভিত্তিক মনোনয়নপত্র জমার পরিসংখ্যান- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ৭০টি, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ৩১টি, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ৬২টি, জগন্নাথ হলে ৫৯টি, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৬৫টি, শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ৮১টি, রোকেয়া হলে ৪৫টি, সূর্যসেন হলে ৭৯টি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৬৫টি, শামসুন নাহার হলে ৩৬টি, কবি জসীমউদদীন হলে ৭০টি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ৭৮টি, শেখ মুজিবুর রহমান হলে ৬৮টি, শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে ৩৬টি, অমর একুশে হলে ৮১টি, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪০টি, বিজয় একাত্তর হলে ৭৬টি এবং স্যার এ এফ রহমান হলে ৬৭টি।

৯ পূর্ণাঙ্গ প্যানেল, চূড়ান্ত তালিকার পর মূল হিসাব নিকাশ
ডাকসু নির্বাচনে ৯টি প্যানেল বিভিন্ন নামে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে। প্যানেলগুলো হলো- ছাত্রদলের প্যানেল, ছাত্রশিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’, বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর মোর্চা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ সমর্থিত প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (মাহির-বাহাউদ্দিন), সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (বাসদ) ও ছাত্রলীগ-বিসিএল (বাংলাদেশ জাসদ) এই ৩ বাম সংগঠনের যৌথ প্যানেল ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’, ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’, ইসালামী ছাত্র আন্দোলনের ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’, ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ এবং ‘স্বতন্ত্র ঐক্যজোট’।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক এবি জুবায়ের ও জুলাই ঐক্যের সংগঠক মুসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ আংশিক স্বতন্ত্র প্যানেলের ঘোষণা দিয়েছেন।

শীর্ষ পদে পদ-প্রত্যাশী যারা 
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ভিপি পদে আবিদুল ইসলাম খান, জিএস পদে তানভীর বারী হামিম এবং এজিএস পদে তানভীর আল হাদী মায়েদ প্রার্থী হয়েছেন। 

শিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে ঢাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে শাখা শিবির সভাপতি এসএম ফরহাদ, সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে শাখা শিবির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন খান প্রার্থী হয়েছেন।

ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেলে ভিপি পদে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা, জিএস পদে সাবিনা ইয়াসমিন এবং এজিএস পদে ঢাবি শাখার সদস্যসচিব রাকিবুল ইসলাম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। 

‘স্বতন্ত্র ঐক্যজোট’ এ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা ভিপি পদে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহী এজিএস ও সমিতির সাবেক সভাপতি আল সাদী ভূঁইয়া জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে ভিপি পদে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের, জিএস পদে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার এবং এজিএস পদে প্রার্থী সংগঠনটির মুখপাত্র আশরেফা খাতুন লড়বেন।

প্রতিরোধ পর্ষদ থেকে ভিপি পদে শামসুন নাহার হল ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সংসদের সভাপতি মেঘমল্লার বসু জিএস পদে, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল এজিএস পদে লড়বেন।

সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দীন খালিদ, জিএস পদে সাবেক সমন্বয়ক মো. আবু সায়াদ বিন মাহিন সরকার এবং এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ফাতেহা শারমিন এ্যানি।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের প্যানেল থেকে ভিপি পদে ইয়াছিন আরাফাত, জিএস পদে খায়রুল আহসান মারজান এবং এজিএস পদে সাইফ মোহাম্মদ আলাউদ্দিন লড়বেন। 

অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪ এ তিন বাম ছাত্রসংগঠনের এই প্যানেল থেকে ভিপি পদে মো. নাইম হাসান হৃদয় এবং জিএস পদে এনামুল হাসান অনয় এবং এজিএস পদে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী অদিতি ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

সব প্যানেলেই বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা
ছাত্রদল: ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তারা তুলনামূলক জুনিয়রদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন। দেরিতে প্যানেল ঘোষণা করলেও ছাত্রদল তাদের প্যানেলে ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ রেখেছে। 

ছাত্রশিবির: ইসলামী ছাত্রশিবির শুধু তার নিজের সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী, আপ বাংলাদেশ, ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের প্যানেলে রেখেছে। শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তারা ইনক্লুসিভ প্যানেল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। 

ছাত্র অধিকার পরিষদ: ভোটের মাঠে আকর্ষণীয় স্লোগান ঠিক করে আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির ভিপি প্রার্থীর ডাকসু নির্বাচন নিয়ে অনশন করার চিত্রও ক্যাম্পাসে ব্যাপক প্রচার করা হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ: গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে যুক্ত পরিচিত মুখ দিয়ে সাজিয়েছে তাদের প্যানেল। যেসব আগ্রহী প্রার্থীকে প্যানেলে জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তারা।

গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট: বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট তাদের জোটভুক্ত ৭ বামপন্থি, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের মতামত আমলে নিয়ে প্যানেল সাজিয়েছে। যদিও সহসভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে নিয়ে কিছুটা বিতর্ক উঠেছে। ২০১৯ সালে এক টকশোতে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ডাকসুর আজীবন সদস্য করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। 

সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং সদ্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে বহিষ্কৃত মাহিন সরকার ও স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দীন খালিদের নেতৃত্বে গঠিত সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেলে বিভিন্ন পদে স্থান পেয়েছে ২০২৪ এর কোটা সংস্কার দাবির আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে পরিচিত মুখরা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামার নেতৃত্বে প্যানেলও পিছিয়ে নেই। তারাও তাদের প্যানেল গুছিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা সর্বোচ্চ আমলে নিয়েছেন। যদিও উমামার নেতৃত্বে এই প্যানেলের পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা করা হয়নি, আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

প্যানেলের বাইরে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত চৌধুরী, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম হোসাইন, ২০০১-০২ সেশনের এবং চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার, জুলিয়াস সিজার তালুকদারসহ আরও অনেকে বেশ আলোচনায় রয়েছেন। 

বাগছাসে বিভক্তি প্রার্থিতা নিয়ে
সংগঠনের প্যানেল থেকে আলাদা হয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। দলীয় প্যানেল থেকে এজিএস পদে প্রার্থিতা চেয়েছিলেন তাহমিদ। কিন্তু পছন্দমতো পদ না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবেই এজিএস পদে নির্বাচন করবেন তিনি। যদিও দলের পক্ষে থেকে দাবি করা হচ্ছে, এটি বিভক্তি না বরং অংশ নিতে তাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটির সদস্যসচিব জাহিদ আহসানের পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়, ‘যেসব নেতাকে এই প্যানেলে জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয় নাই, তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটা সংগঠনের ভাঙন বা বিভক্তি নয়।’ এদিকে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের আরেক নেত্রী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করে ডাকসুতে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

গবেষণা সম্পাদক পদে প্রার্থী দিচ্ছে না ছয় সংগঠন
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত শিক্ষার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বীর প্রতি সম্মান জানিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ছয় সংগঠন কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। 

প্রসঙ্গত, ডাকসুর ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আজ বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) প্রাথমিক প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশিত হবে। চার দিনের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে ২৬ আগস্ট প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ এবং সব শেষে ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

Comments

Popular posts from this blog