পরিবেশবান্ধব ব্যাগে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

অনেক স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীর একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থায় কাজ শুরু করেছিলেন রংপুরের জুয়েনা ফেরদৌস মিতুল। কিন্তু সে চাকরি স্থায়ী হয়নি। ২০১৭ সালে সব ছেড়ে চলে যান রংপুরে। বিয়ে বিচ্ছেদের কারণে শুরুতে দুই সন্তান নিয়ে জীবনধারণে খানিকটা হোঁচট খেতে হয় তাঁকে। পরে চাকরি নেন একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে। করোনার সময়ে সেটাও চলে যায়। এরপর দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। হঠাৎ এক বন্ধুর পরামর্শে শুরু করেন কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘আহ্লাদ’। নিজস্ব নকশায় তৈরি পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ বানিয়ে গল্পটা সাফল্যের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন জুয়েনা। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে তৈরি ব্যাগ রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে। সেসঙ্গে কর্মসংস্থান হয়েছে বেশকিছু নারীর।

জুয়েনা জানান, ২০১৭ সালে সুইডেন প্রবাসী এক বন্ধু ফোন করে জানায়, তার কিছু পরিবেশবান্ধব ব্যাগ প্রয়োজন। সেই ব্যাগের উপাদান খুঁজতে গিয়ে পাটজাতীয় পণ্যের প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। অন্যের কারখানায় ছোট পরিসরে শুরু করেন নিজস্ব নকশায় পাটের ব্যাগ তৈরি। তবু যেন সবকিছু মনমতো হচ্ছিল না। এরপর ২০২১ সালে রংপুর শহরের কেরানীপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন আহ্লাদ। প্রথমে একটি সেলাই মেশিন ও একজন কর্মী নিয়ে যাত্রা হলেও পরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। 

১৯৯২ সালে ঢাকার ভিকারুননিসা নুন স্কুল থেকে এইচএসসি পাসের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন জুয়েনা। নৃতত্ত্ব বিভাগের ২৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী থাকাকালীন কর্মজীবন শুরু করেন। পরিচালক তারেক মাসুদের মুক্তির কথা, নারীর কথা, মাটির ময়না ও অন্তর্যাত্রা সিনেমায় সহকারী পোশাক পরিকল্পকের কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন ‘গাঁও’ নামের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে। 

বর্তমানে আহ্লাদে নানা ধরনের ব্যাগের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে পাটের খেলনা, শোপিস, ওয়ালম্যাট, পাপোশ, শিকা, দড়ি ইত্যাদি পণ্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উচ্ছিষ্ট নানা জিনিস দিয়ে তৈরি হচ্ছে শোপিস। জুয়েনা জানান, আহ্লাদ পাট, ক্যানভাস, ডেনিম কাপড় ও রিসাইকেল শাড়িসহ পরিবেশবান্ধব নানা উপকরণ দিয়ে পণ্য তৈরি করছে। স্কুল ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, অফিস ব্যাগ, গিটার ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, শপিং ব্যাগ, ক্যামেরা ব্যাগ, লাঞ্চব্যাগসহ নানা ধরনের ব্যাগ তৈরি করেন তারা। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫ জন নারী কাজ করছেন। এছাড়া রংপুরের চারটি গ্রামে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেন আরও কয়েকজন নারী। দেশের বাজারের পাশাপাশি আহ্লাদে তৈরি ব্যাগ যাচ্ছে বিদেশেও। চাহিদা অনুযায়ী এসব ব্যাগ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সরবরাহ করছেন। 

জুয়েনা ইতোমধ্যে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পিকেএসএফের দুটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। রংপুর সদর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পেয়েছেন ‘জয়িতা’ সম্মাননা। আহ্লাদ ফ্যাশনে কাজ করা রিক্তা রানী মোহন্ত, মঞ্জিলা বেগম ও আলেয়া বেগম বলেন, ‘আমরা এখানে চুক্তিভিত্তিক কাজ করছি। কাজ অনুযায়ী টাকা পেলেও গড়ে প্রতিদিন ৫০০ টাকা আয় হয়। এছাড়া বাড়িতে ছোট পরিসরে নিজেরাও পণ্য উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছি।’ 

Comments

Popular posts from this blog