কাজ শেষ হওয়ার আগেই রংপুরে নদী তীর রক্ষা বাঁধে ধস 



রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই আখিরা শাখা নদীর তীর রক্ষা বাঁধের একাংশ ধসে পড়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করা হয়েছে বলে বাঁধের এই দশা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত আখিরা শাখা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের প্রায় ১০০ মিটার অংশ ধসে পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টির মধ্যে তড়িঘড়ি করে কাজ করায় এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নদীর তীর সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে বসেছে।

তবে ব্লক ধসে যাওয়ার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ অস্বীকার করে মাটির সমস্যার কথা জানিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, নদী তীর সংরক্ষণ, খালবিল পুনর্খনন ও জলাবদ্ধতা নিরসন (১ সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় রংপুরের পীরগঞ্জের চতরা ইউনিয়নে ৮০০ মিটার নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধের কাজ চলছে। ৫ কোটি ৩৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৭ টাকার কাজটি করছেন রংপুরের ঠিকাদার ভরত প্রসাদ। দুই বছর মেয়াদি কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন কাজটি শেষ হওয়ার কথা।

সরেজমিনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজই প্রায় শেষ। বসানো হচ্ছে ব্লক। তবে, ব্লক বসানো শেষ হওয়ার আগেই অনেক অংশের ব্লক খসে পড়েছে। ওয়াকওয়ের টাইলস উঠে যাচ্ছে। পাশে কোনো সাইনবোর্ডও নেই।

স্থানীয়রা বলেন, কাজের মান এতই নিম্নমানের যে বন্যা হলে তীর সংরক্ষণ বাঁধ রক্ষা করাই সম্ভব হবে না। তাদের অভিযোগ, মাটি ফেলে তা সঠিকভাবে ডাম্পিং করা হয়নি। মাটি নরম থাকায় ব্লক ঠিকমতো থাকছে না।

কাজের তদারকিতে থাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, কাজের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। যেখানে যেখান সমস্যা হচ্ছে বা হবে, সেখানে মেরামত করা হচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, দায় সারা কাজ করার কারণে বাঁধ বেশিদিন টিকবে না। সরকারের কোটি কোটি টাকা পানিতে ভেসে যাবে। নদীর পাড় রক্ষায় সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাজ করছে যাতে স্থানীয়দের উপকার হয়। কিন্তু যে কাজ করছে তা শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই কাজে আমাদের বসতবাড়ি ও আবাদি জমি রক্ষা পাবে না। বন্যা হলে আবারও নদীর পাড় ভাঙতে পারে।

স্থানীয় এক ইউপি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঠিকাদারের লোকজন তড়িঘড়ি করে ব্লক নির্মাণ করে পাড়ে সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে দেন। সে কারণেই এই অবস্থা। সেখানে ব্লক নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী। এসব দেখেও না দেখার ভান করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তদারক কর্মকর্তারা।

এ ব্যাপারে ঠিকাদার ভরত প্রসাদ বলেন, দুই পাশে ৪৮০ মিটার কাজ প্রায় শেষ করেছি। ১৩০ মিটার কাজ ঠিক আছে। তবে কোথাও কোথাও মাটির লেয়ারে সমস্যা থাকায় ধসে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘একবার ঠিক (মেরামত) করেছি, আবারও সমস্যা হয়েছে। এই মৌসুমে ঠিক করা যাবে না। মাটির লেয়ারে সমস্যা ছিল। পরিস্থিতি ভালো হলে আবার কাজটি ঠিক করা হবে।’

প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী টিএম ইসরাফিল হক বলেন, ‘কোনো অনিয়ম হয়নি। প্রকল্পটি ছিল সৌন্দর্যবর্ধনের। চুক্তিতে ডাম্পিং ছিল না। অতিরিক্ত পানির চাপের কারণে কিছু অংশ ধসে গেছে। আমরা ঠিকাদারকে চিঠি দিয়ে সেটি মেরামত করতে বলেছি।’

স্থানীয়দের অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে সহকারী প্রকৌশলী বলেন, ‘অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। ব্লক তৈরিতে বুয়েট থেকে টেস্ট করিয়েছি। শুরুতে কিছু সমস্যা ধরা পড়লে সেগুলো বাতিল করা হয়। এক বছরে এই ব্লকে কোনো সমস্যা হলে ঠিকাদার তা মেরামত করবেন—তার সঙ্গে আমাদের এই চুক্তি রয়েছে।’

পাউবো রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কাজটিতে তাড়াহুড়োর কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওই খাল লিজ দেওয়া ছিল। এপ্রিল পর্যন্ত তাতে পানি ছিল, আবার মে মাসে নতুন করে পানি হয়েছে। মূলত পানি ও মাটির সমস্যার কারণে এই ধস।’

‘তিনি বলেন, ‘কাজের কোনো সমস্যা হলে ঠিকাদার এক বছর মেরামত করে দেবেন। সেই হিসেবে তারা কাজ করছে।’

Comments

Popular posts from this blog